
প্রবাসীর গল্প:
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশযাত্রা মানেই চোখের পলকে এক ঝলমলে জীবনের সূচনা—এমন ধারণা অনেকের মনেই থাকে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নত বিশ্বের কোনো ব্যস্ত শহরে পা রাখার পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সামনে যে বাস্তবতা উন্মোচিত হয়, তা অনেক সময়ই ভিন্ন এক সংগ্রামের গল্প বলে। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্লাসের ফাঁকে রেস্তোরাঁয় কাজ, ক্লিনিং সার্ভিস কিংবা উবারে খাবার ডেলিভারি দিয়ে দিন পার করা—এ যেন হাজারো শিক্ষার্থীর চেনা এক রুটিন। মাঝরাতের পর বাসায় ফিরে মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে ভোরে আবার কাজের উদ্দেশ্যে ছুটে চলা বর্তমান শিক্ষার্থীজীবনের এক নির্মম বাস্তবতা।
হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা কাজের শিডিউলে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলে অনেক সময় চাকরি হারানোর মতো বিপদের মুখে পড়তে হয়। দেশে সচ্ছল পরিবার বা আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিদেশে গিয়ে এই তরুণদের একা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াই করতে হয়। চারপাশের অপরিচিত পরিবেশে বিপদে পাশে দাঁড়ানোর আপনজন না থাকলে উচ্চশিক্ষার এই স্বপ্নযাত্রা বহু শিক্ষার্থীর জন্যই টিকে থাকার এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়।
কেন দেশ ছাড়েন তরুণেরা: পুশ ও পুল ফ্যাক্টর
তরুণদের এই বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাকে সমাজবিজ্ঞানে মূলত ‘পুশ’ ও ‘পুল’ ফ্যাক্টরের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়:
• পুশ ফ্যাক্টর (দেশ ছাড়ার তাড়না): এর মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সীমিত সুযোগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা।
• পুল ফ্যাক্টর (গন্তব্য দেশের আকর্ষণ): উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার মানসম্মত পরিবেশ, আন্তর্জাতিক ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা, উন্নত জীবনযাত্রা এবং একটি স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী করে তোলে।
তবে কেবল এই কাঠামোগত কারণ দিয়ে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সাথে যুক্ত থাকে ব্যক্তির নিজস্ব ক্যারিয়ার-পরিকল্পনা, উন্নত জীবনের স্বপ্ন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ, যাকে সমাজবিজ্ঞানে ‘এজেন্সি’ বা ব্যক্তিগত সক্ষমতা বলা হয়। ব্রনফেনব্রেনারের সামাজিক পরিবেশতত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষের বিকাশ কেবল তার নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাব তার জীবনকে রূপ দেয়।
ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প: নাদিম হোসেন
এই বৈশ্বিক কাঠামোগত লড়াই এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ নাদিম হোসেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশের ‘ছোটাবন্দ সুলতান মাহমুদ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়’ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। পরবর্তীতে নিজের ক্যারিয়ারের গতিপথ পরিবর্তন করে উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
বর্তমানে তিনি ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাস করছেন এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে আইটি বিভাগের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে শেষ বর্ষের ব্যাচেলর শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা শেষ করার পথে রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। নাদিম হোসেনের এই জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথচলা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়; এটি কাঠামোগত বাধা, পুশ-পুল ফ্যাক্টরের বাস্তবতা এবং নিজের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এক সফল ভবিষ্যতের রূপকথা।
প্রবাসের অভিজ্ঞতা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা
বিদেশের মাটিতে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যারা আজ নিজেদের দক্ষতায় প্রতিষ্ঠিত করছেন, তাদের এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদেশযাত্রার এই কঠিন অভিজ্ঞতা একজন তরুণকে মানসিকভাবে আরও বেশি পরিপক্ক, আত্মবিশ্বাসী ও দূরদর্শী করে তোলে। উন্নত বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি, কর্মসংস্কৃতি, গবেষণা পদ্ধতি এবং সমস্যার সৃজনশীল সমাধানের যে জ্ঞান তারা অর্জন করেন, তা দেশের রূপান্তরের এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে।
শিক্ষা শেষে বা অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে যখন এই তরুণেরা দেশে ফেরেন, তখন তারা শুধু একজন একাডেমিশিয়ান বা প্রফেশনাল হিসেবে ফেরেন না; তারা হয়ে ওঠেন দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ, তরুণ প্রজন্মের মেন্টরশিপ এবং আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির অগ্রদূত। বিদেশে অর্জিত উচ্চশিক্ষা ও বিশ্বমানের অভিজ্ঞতাকে দেশের মানুষের কল্যাণে, আইটি খাতের প্রসারে এবং একটি স্মারক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ব্যবহার করা সম্ভব। প্রবাসের এই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতেই মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তনের এক নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।