
সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ও সাবেক নেতাদের বিএনপিতে যোগদান করানোকে কেন্দ্র করে জেলা রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড়, তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত যোগদান কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি। এ ঘটনায় দলটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফুলের তোড়ায় যোগদান, রাতেই শুরু বিতর্ক
জেলা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১০ জানুয়ারি রাত ৯টায় সাতক্ষীরা শহরে জেলা বিএনপির আহবায়ক রাহমাতুল্লাহ পলাশের বাসভবনে ফুলের তোড়া দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন দুই ব্যক্তি। তারা হলেন—খাজরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব মো. ওয়াহিদুল ইসলাম এবং দরগাহপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক চেয়ারম্যান এস এম জমির উদ্দিন গাজী। যোগদানের সময় জেলা বিএনপির আহবায়ক ও সদস্য সচিব উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
যোগদানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ফেসবুকে দলীয় নেতাকর্মীদের একাধিক পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়—
“বিএনপি কি ত্যাগী নেতাকর্মীশূন্য হয়ে গেছে?”
“টাকার বিনিময়ে যোগদান করানো হয়েছে কি না?”
“যারা গতকাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ করেছে, আজ তারা কীভাবে বিএনপির পতাকা ধরছে?”
এমনকি কেউ কেউ “২৫ লক্ষ টাকার দফারফা” বলেও মন্তব্য করেন, যা বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
তৃণমূলের বিক্ষোভ: ‘এধরনের যোগদান মানি না’
ঘটনার জেরে ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দরগাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সেখানে তারা “এধরনের যোগদান মানি না, মানবো না”সহ বিভিন্ন শ্লোগান দেন। সমাবেশ থেকে দলীয় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়।
চাপের মুখে স্থগিতাদেশ
তীব্র সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পর ১১ জানুয়ারি রাত ১০টার দিকে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, স্থানীয় পর্যায়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উক্ত দুই ব্যক্তির বিএনপিতে যোগদান কার্যক্রম স্থগিত করা হলো।
আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন,
“যোগদানের পর বিতর্ক শুরু হওয়ায় আমরা তা স্থগিত করেছি। আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
যোগদানকারীদের পাল্টা বক্তব্য
খাজরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ওয়াহিদুল ইসলাম দাবি করেন,
“হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে নামমাত্র কমিটিতে ঢুকেছিলাম। আমি প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ করিনি। একটি মহল আমাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে ষড়যন্ত্র করছে।”
অন্যদিকে দরগাহপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জমির উদ্দিন গাজী বলেন,
“আমি কখনো আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলাম না, শুধু চলাফেরা ছিল।”
তবে স্থানীয় বিএনপি ও রাজনৈতিক মহলের দাবি, জমির উদ্দিন গাজী আশাশুনি উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী গ্রুপের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন—যা তার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রশ্নের মুখে জেলা বিএনপির সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া
এই ঘটনায় সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শ ও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা যাচাই না করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে ভেড়ানো বিএনপির জন্য ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।