নিজস্ব প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অবৈধ ইটভাটা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যাওয়ায় এক সাংবাদিককে ‘বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসবো’ বলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামছুজ্জাহান কনকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন উপস্থিত সাংবাদিকরা।
প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর পৌরসভা এলাকায় একটি ইটভাটা পুনর্নির্মাণের বিষয়ে বক্তব্য নিতে তাঁরা ইউএনওর কার্যালয়ে যান। এ সময় অবৈধ ইটভাটা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউএনও সামছুজ্জাহান কনক বলেন, “আমার কাছে ইটভাটার কোনো তথ্য নেই। এগুলো জেলা থেকে (ডিসি অফিস) নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই ইটভাটা সম্পর্কে আমার কোনো বক্তব্য নেই।”
সাংবাদিকদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে সংবাদে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের প্রসঙ্গ তুলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ‘বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসবো’ বলে মন্তব্য করেন ইউএনও। একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন মন্তব্যের অভিযোগকে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাংবাদিকদের মতে, অবৈধ ইটভাটা পরিচালনার মতো পরিবেশ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া সাংবাদিকতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কোনো বিষয়ে তথ্য না থাকা বা বক্তব্য দিতে অপারগতার কথা জানানো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অধিকার। তবে সংবাদে বক্তব্য প্রকাশের কারণে একজন সাংবাদিককে বাসা থেকে তুলে আনার কথা বলার অভিযোগ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন বলেন, “স্থানীয় ইউএনওর এ ধরনের আচরণ করা উচিত নয়। একজন সাংবাদিক বক্তব্য চাইতেই পারেন। তবে তাঁকে বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসব—একজন সরকারি কর্মকর্তা এ ধরনের কথা বলতে পারেন না। এটা অনুচিত।”
অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে তিনি বলেন, অবৈধ ইটভাটা চালানোর কোনো সুযোগ নেই। খুব শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং যেসব ইটভাটা অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হবে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।
বিভাগীয় কমিশনারের এ বক্তব্যে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে শ্যামনগরে অভিযোগ ওঠা ইটভাটাগুলোর বৈধতা যাচাই এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
সাংবাদিক নেতার নিন্দা ও তদন্তের দাবি
সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের নিন্দা জানিয়ে সাতক্ষীরা অপরাধ উন্মোচন ক্লাবের সভাপতি ও সাংবাদিক মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, “একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন উদ্ধতপূর্ণ আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়। সাংবাদিকরা জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। এ কাজে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি ইউএনও সামছুজ্জাহান কনকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অবৈধ ইটভাটা বন্ধের দাবি
এদিকে, অবৈধ ইটভাটা এবং সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোনটি অন্য একজন রিসিভ করায় জেলা প্রশাসকের সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটার বৈধ লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনা এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন সচেতন নাগরিকরা। এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাংবাদিকদের দাবি, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে যেন কোনো গণমাধ্যমকর্মী হুমকি বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের শ্যামনগর উপজেলা প্রতিনিধি আঃ হাকিম, দৈনিক কালের কণ্ঠের শ্যামনগর উপজেলা প্রতিনিধি আঃ আজিজ, গ্রামের কাগজের প্রতিনিধি ইয়াছিন মোড়লসহ আরও অনেকে।