ছোট গ্রাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে—উচ্চশিক্ষা শেষে দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয়
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে মোছা: মোস্তাকিমার রহমান রিতু (তাহা)। ছোট একটি গ্রাম, সীমিত সুযোগ, শৈশবের নানা প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পড়াশোনার সংগ্রাম—কোনোটিই তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। পরিবারের ভালোবাসা, ভাই-বোনের অনুপ্রেরণা, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং নিজের কঠোর পরিশ্রমকে পুঁজি করে আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত Washington University of Science and Technology (WUST)-এ Cybersecurity বিষয়ে মাস্টার্স করছেন তিনি।
ভবিষ্যতে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে আরও উচ্চতর গবেষণা করে অর্জিত জ্ঞান বাংলাদেশের মানুষের ও দেশের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তায় কাজে লাগানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বড় ভাই-বোনের হাত ধরে শিক্ষাজীবনের শুরু
মোস্তাকিমার রহমান রিতুর শিক্ষাজীবনের শুরুতেই বড় ভূমিকা রাখেন তার বড় বোন সোহানা আক্তার এবং বড় ভাই রায়হানুল ইসলাম। তাদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার।
বাড়ির পাশে অবস্থিত ১২৭ গড়েয়া গোপালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। পরে চাচাতো ভাই নুরে আলমের প্রতিষ্ঠিত গড়েয়া কিন্ডারগার্টেনে পড়াশোনা করেন। এরপর আবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিরে পঞ্চম শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করেন।
অসুস্থতাও থামাতে পারেনি শিক্ষার পথ
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন গড়েয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকায় তার পড়াশোনায় নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।
তবে শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও হাল ছাড়েননি তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পড়াশোনা
গড়েয়া থেকে ঠাকুরগাঁও শহরের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। সে সময় নিজ এলাকায় প্রয়োজনীয় বিষয়ে ভালো শিক্ষক পাওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। ফলে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে তাকে নিয়মিত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে টিউশন নিতে হতো।
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর কিংবা বর্ষার প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনোটিই তার শিক্ষার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যান তিনি।
এইচএসসির পাশাপাশি মেডিকেল কোর্স
পরবর্তীতে গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন মোস্তাকিমার রহমান রিতু। এইচএসসি পড়ার সময়ই তিনি ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল কোর্স সম্পন্ন করেন।
এরপর পাবনার সাঁথিয়া কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন। অনার্সের পাশাপাশি প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকে উত্তরা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট থেকে কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
শিক্ষাজীবনকে শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি রিতু। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন।
তিনি বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং আনন্দ টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
কলেজজীবনে তিনি গার্লস ইন রোভার-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ সময় বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ
অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে খাদ্য বিতরণ, পোশাক ও উপহারসামগ্রী বিতরণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আর্থিক সহযোগিতা, বৃক্ষরোপণ, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন তিনি।
তার কাছে শিক্ষা শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার মাধ্যম নয়; বরং সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি শক্তি।
সংস্কৃতিতেও ছিল সক্রিয়তা
ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রিতু। তিনি ঠাকুরগাঁও বেতারে শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন।
স্কুল ও কলেজজীবনে বিভিন্ন প্রতিভা বিকাশমূলক কর্মকাণ্ড ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কৃতও হয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ড তার আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে ভূমিকা রাখে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ
দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, বাবা-মায়ের দোয়া, বড় ভাই-বোনের অনুপ্রেরণা এবং পরিবারের সহযোগিতায় ২০২৪ সালে তার জীবনে আসে নতুন অধ্যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে তিনি বর্তমানে ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত Washington University of Science and Technology (WUST)-এ Cybersecurity বিষয়ে মাস্টার্স করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি সেমিস্টারে ভালো ফলাফলের কারণে তিনি Presidential Award অর্জন করছেন।
গড়েয়ার একটি ছোট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাজীবন আজ তাকে নিয়ে গেছে হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে।
লক্ষ্য শুধু মাস্টার্স নয়, করতে চান পিএইচডি গবেষণা
উচ্চশিক্ষার এই যাত্রা শুধু মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না রিতু।
তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে মাস্টার্স শেষ করার পর সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে পিএইচডি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে তিনি গবেষণাপত্র নিয়েও কাজ শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে সাইবার সিকিউরিটি গবেষণায় আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে নিজেকে একজন দক্ষ গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।
বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তায় কাজ করার স্বপ্ন
বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, সরকারি ডিজিটাল সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসায় প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও।
রিতুর স্বপ্ন—উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো।
তরুণদের সাইবার সিকিউরিটিতে যুক্ত করতে চান
দেশে ফিরে দক্ষ সাইবার সিকিউরিটি পেশাজীবী তৈরিতে কাজ করতে চান তিনি।
বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণদের সাইবার সিকিউরিটিতে আগ্রহী করে তুলতে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, মেন্টরশিপ এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তার।
তার লক্ষ্য—শুধু শহরের শিক্ষার্থীদের নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদেরও প্রযুক্তি ও সাইবার সিকিউরিটিতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি করা।
গড়েয়ার মাটি থেকে বিশ্বমঞ্চে
গড়েয়ার একটি ছোট গ্রামের সাধারণ পরিবেশ থেকে শুরু করে অসুস্থতা, সীমিত সুযোগ, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পড়াশোনা এবং নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা—মোস্তাকিমার রহমান রিতুর পথচলা তার নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি গ্রামবাংলার শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার গল্প।
তার বিশ্বাস, সুযোগ সীমিত হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন ও পরিশ্রম থাকলে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা সম্ভব।