প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ৩:১১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ আগস্ট ১০, ২০২৬, ৮:২৮ অপরাহ্ণ
অভিযোগের পর ১৫ জনের জবাব, তবু তথ্য গোপন কেন? তথ্য অধিকার আইনে কপি চেয়ে ‘অভ্যন্তরীণ গোপনীয়’ অজুহাতে তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ তালা ইউএনও’র বিরুদ্ধে
রুহুল আমিন, তালা (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, আর্থিক েঅসঙ্গতি, অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অভিযোগ তদন্তের বদলে এখন প্রশ্ন উঠেছে অভিযোগের জবাব কেন গোপন রাখা হচ্ছে—তা নিয়ে।
বিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পক্ষে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার প্রভাষ কুমার দাশ প্রধান শিক্ষকের নিকট লিখিত জবাব চান।
প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর লিখিত জবাব দাখিল করেন। এরপর অভিযোগকারী ও বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য সাংবাদিক এম একরামুল হক আসাদ তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ওই জবাবের ফটোকপি চান।
কিন্তু তাঁর অভিযোগ, ইউএনও কার্যালয় থেকে চাহিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলা হয়েছে—এটি বিদ্যালয়ের ‘অভ্যন্তরীণ গোপনীয় বিষয়’।
এতেই প্রশ্ন উঠেছে—একটি অভিযোগের ভিত্তিতে যখন সরকারি প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে লিখিত জবাব নেয়, তখন সেই জবাব কি নিছক বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নথি, নাকি অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ? আর তথ্য না দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনের কোনো নির্দিষ্ট অব্যাহতির ধারা প্রযোজ্য কি না, সেটিও এখন আলোচনায়।
অভিযোগ থেকে প্রশাসনিক জবাব ইউএনও বরাবর দেওয়া অভিযোগে এম একরামুল হক আসাদ দাবি করেন, বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগে বিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক আতিয়ার রহমানকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের বিরোধ বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষের জানালার কাঁচ দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি এবং শীতকালে ঠান্ডা বাতাস শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করায় শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগের মধ্যে পাঠ গ্রহণ করছে। শ্রেণিকক্ষের পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণেও অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন, পরীক্ষা ফি ও অন্যান্য খাতে অর্থ আদায় করা হলেও বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে না।
অভিযোগকারী এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয় ও উন্নয়ন খাতের ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
১৫ জনের লিখিত জবাব, এরপরই তথ্যের প্রশ্ন
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কাছে লিখিত জবাব চাওয়া হয় বলে জানান অভিযোগকারী। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা ইউএনওর কাছে লিখিত জবাব দাখিল করেছেন বলেও তাঁর দাবি।
এরপরই বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।
অভিযোগকারী এম একরামুল হক আসাদ ওই লিখিত জবাবগুলোর ফটোকপি চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন। তাঁর যুক্তি—তিনি নিজেই অভিযোগকারী; তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রশাসন জবাব চেয়েছে; ফলে অভিযোগের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য কী ছিল, তা জানার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
কিন্তু তাঁর দাবি, ইউএনও কার্যালয় থেকে তাঁকে জানানো হয়, এসব তথ্য বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও গোপনীয় বিষয়।
এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন—প্রশাসনের কাছে দাখিল করা একটি লিখিত জবাব কীভাবে শুধু ‘বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হয়ে যায়?
তথ্য অধিকার আইনে কী বলা আছে?
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় ‘তথ্য’ বলতে সরকারি কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি, চিঠি, প্রতিবেদন, হিসাবসহ বিভিন্ন ধরনের দলিলকে বোঝানো হয়েছে। একই আইনে নাগরিকের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে।
তবে সব তথ্য প্রকাশযোগ্য নয়। আইনটির ধারা ৭-এ নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির তথ্য প্রকাশ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিধান রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো বিচারাধীন বিষয় বা আইনে নির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত তথ্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হতে পারে। তথ্য কমিশনের একটি সিদ্ধান্তেও ধারা ৭-এর নির্দিষ্ট বিধান প্রয়োগ করে তথ্য না দেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তাই অভিযোগকারীর দাবি যেমন তদন্তের দাবি রাখে, তেমনি অভিযুক্তদের বক্তব্যও সমানভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে পুরো ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে—
একজন নাগরিক অভিযোগ করলেন।
প্রশাসন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর লিখিত জবাব নিল।
তারপর সেই জবাবের কপি চেয়ে অভিযোগকারী তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলেন।
এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং তথ্য গোপনের বিতর্ক—দুটিই অনিষ্পন্ন থেকে যাচ্ছে।
স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে এবং তথ্য অধিকার আইনের বিধান অনুসারে চাহিত তথ্য প্রদানের বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানাবে।
কারণ, বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় স্বার্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়—শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছ শিক্ষার পরিবেশ।
Copyright © 2026 দৈনিক আলোর সন্ধান. All rights reserved.